
খলিফা আবদুল মালিক ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। পুরো রাজ্য চষে বেড়ালেন। কাউকেই মনঃপূত হলো না। অবশেষে সন্ধান মিলল কাঙ্ক্ষিত সেই পাত্রীর। মদিনার ফকিহ সাঈদ ইবনুল মুসায়িবের কন্যা। তড়িঘড়ি করে প্রস্তাব পাঠানো হলো। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এ প্রস্তাবকে গনিমত মনে করবেন – এমনটিই ধারণা ছিল খলিফা আবদুল মালিকের। কিন্তু ফিরতি সংবাদে খলিফার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। তিনি তার মেয়েকে খলিফাপুত্রের কাছে বিয়ে দেবেন না। বিশ্বাস হলো না খলিফার। বিশ্বাস হলো না রাজ্যের কারই।
এই দিকে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের এক প্রিয় ছাত্র ছিল। বেশ কিছুদিন সে তার উস্তাদের দরসে আসছে না। কেউ জানেও না কী হয়েছে তার। অনেকদিন পর সেই ছাত্র দরসে এসে উপস্থিত।
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় ছিলে?’
‘আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে। তাই এ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।’ ছাত্র বলল,
‘আমাকে সংবাদ দিলে না কেন? আমিও তার জানাযায় উপস্থিত হতাম। আচ্ছা তুমি কি আবারও বিয়ে করেছো?’
‘আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। আমার কাছে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমি তো দুই-তিন দিরহামেরও মালিক নই।’
‘আমি মেয়ে বিয়ে দেব।’
ছাত্র অবাক হয়ে গেল। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দরুদ পড়লেন এবং দুই দিরহাম মোহরের বিনিময়ে তার মেয়ের সাথে ছাত্রের বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তিন দিরহাম। যেদিন বিয়ে হলো, সেদিন রাতেই মেয়েকে তিনি নিজ হাতে পাত্রের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আছেন। এটাও বর্ণিত আছে বিয়ের এক মাস পর শ্বশুর সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) তার ছাত্রকে বিশ হাজার দিরহাম হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন।
আধুনিক সমাজের জন্য এ ঘটনায় অগনিত শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। ঘুণে ধরা বর্তমান সমাজ বিয়েকে কঠিন করে দিয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে রূপ-লাবণ্য এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে বিপুল অর্থকড়ি আর ক্যারিয়ারকে বানানো হয়েছে যোগ্যতার মাপকাঠি। তাদের জন্য এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে বহুকিছু।
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব খলিফার ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেননি। খলিফার ধন-সম্পদের অভাব ছিল না। প্রভাব প্রতিপত্তির অন্ত ছিল না। সেখানে তার মেয়ে বড্ড সুখে থাকতো। কিন্তু বিপুল পার্থিব শান-শওকত থাকলেও সেখানে ছিল না দীনদারি ও তাকওয়ার মহা দৌলত। আর এ দীনদারি ও তাকওয়াই বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণীয় বিষয় হওয়া বাঞ্চনীয়। তাহলেই বিয়ে বিচ্ছেদ কমে আসবে। নেক সন্তান জন্ম নেবে।
তার সাথী-সঙ্গীরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি আমিরুল মুমিনিনের ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অথচ একজন সাধারণ হতদরিদ্র যুবকের সাথে বিয়ে দিলেন। এর কারণ কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন – দেখুন আমার কন্যা আমার কাঁধে অর্পিত একটি আমানত। আমি পরহেযগার ও যোগ্য পাত্রের কাছে তাকে পাত্রস্থ করতে চেয়েছি। তাকে বলা হলো, সেটি কীভাবে? যার নিকট মাত্র দুটি দিরহাম আছে। যার খাদ্যের যোগান তেল ও একটি রুটি। বাসস্থান একটি কুঁড়েঘর। তার চেয়ে তো খলিফার ছেলেই উত্তম ছিল। তিনি বললেন – তোমাদের কী ধারণা? আমার মেয়ে যখন বনু উমাইয়াদের প্রাসাদে গিয়ে বিভিন্ন মূল্যবান পোশাকে নিজেকে আচ্ছাদিত করতো, তার সামনে পিছনে ও ডানে-বামে দাসীরা ঘুরোঘুরি করতো, আর সে নিজেকে খলিফার স্ত্রী মনে করতো – তখন তার দীন কোথায় যেত?
আবদুল মালিকের ছেলের সাথে নিজ কন্যাকে বিয়ে না দেওয়ায় সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে শীতের দিনে একশোটি বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। তার উপর এক কলস পানি ঢালা হয়েছিল এবং পশমের জুব্বা পরানো হয়েছিল।
এমনই ছিল তার দুনিয়াবিমুখতার নমুনা। তিনি প্রথম সারির তাবেয়ি ছিলেন। ছিলেন মদিনার ইমাম ও ফকিহ। তিনি অনেক সাহাবির সাক্ষাতে ধন্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে হযরত ওমর, উসমান, আলি (রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) উল্লেখযোগ্য।
‘সালাফদের ইবাদাত’ বই থেকে চয়িত।
