মদিনার ব্যস্ত বাজারে প্রিয়নবী (ﷺ) একবার এক দরিদ্র সাহাবির পেছন থেকে দুই বাহু চেপে ধরেছিলেন।আমরা কখনো কখনো দুষ্টুমির ছলে পেছন থেকে যেভাবে বন্ধুর চোখ চেপে ধরি, নবীজির এই ঘটনাও ছিল অনেকটা তেমন।সেই সাহাবির নাম জাহির (রা.)। দেখতে তিনি সুদর্শন ছিলেন না। তিনি ছিলেন গ্রামের সাহাবি। গ্রামে নানা ধরনের ফল-ফসল উৎপাদন করে তিনি মদিনার বাজারে বিক্রি করতে আসতেন।তিনি যখন মদিনায় আসতেন, নবীজির ﷺ জন্য গ্রাম থেকে হাদিয়া আনতেন। আবার নবীজিও (ﷺ) তাকে শহুরে হাদিয়া দিতেন।নবীজি (ﷺ) তাকে বলতেন, জাহির আমাদের গ্রাম আর আমরা জাহিরের শহর। বোঝাই যায়, দুজনের মাঝে চমৎকার এক ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল।একবার নবীজি (ﷺ) মদিনার বাজারে গিয়ে জাহিরকে পণ্য বিক্রি করতে দেখলেন। গ্রাম থেকে আসা এই সহজ-সরল সাহাবির সাথে স্নেহময় রসিকতা ইচ্ছা করল নবীজির।তিনি পেছন থেকে দুই বাহু আকড়ে ধরলেন জাহিরের। এমনভাবে ধরলেন, জাহির নবীজিকে দেখতে পান না। ব্যস্ত বাজারে পণ্য বিক্রির সময় এমন রসিকতা কারই ভালো লাগে! জাহির (রা.) খানিকটা বিরক্ত হলেন—কে তুমি? আমাকে ছাড়ো!ঠিক তখনই জাহিরের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে বেজে উঠল নবীজির কণ্ঠ—কেউ কি আছ, আমার এই গোলামটাকে ক্রয় করবে?নবীজির (ﷺ) কণ্ঠ শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন জাহির। নিজের কানকে যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই ব্যস্ত বাজারে তার মতো সাধারণ এক গ্রাম্য লোকের সাথে এমন রসিকতা করছেন নবীজি! মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান! কী অবিশ্বাস্য ঘটনা!এই মুহূর্তে ঠিক কী করা যায়? হঠাৎ তার মস্তিষ্কে ঝিলিক দিয়ে উঠল এক অভিনব ভাবনা।নবীজির পবিত্র দেহের সঙ্গে তার সাধারণ শরীর ছোঁয়ানোর এই তো অপূর্ব সুযোগ! এমন সুযোগ হয়তো আর কোনোদিন আসবে না ভবিষ্যতে। জাহির (রা.) আর দেরি করেন না। নিজের পিঠটাকে তিনি নবীজির বুক ও পেটের দিকে ঠেলতে থাকেন। এরপর বলেন, হে আল্লাহর রাসুল ﷺ, আমার মতো সামান্য এক গ্রাম্য মানুষকে বিক্রি করে আপনি কতইবা মূল্য পাবেন!নবীজি (ﷺ) তখন মমতামাখা কণ্ঠে বলেন, মানুষের কাছে তোমার মূল্য সামান্য হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে তোমার দাম অনেক বেশি। প্রিয় পাঠক, চোখ বন্ধ করে জাহির রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া মদিনা বাজারের ওই দৃশ্যটা কল্পনা করুন। আপনি অশ্রু সংব’রণ করতে পারবেন না। এমনই ছিলেন আমাদের নবীজি (ﷺ)। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হওয়া সত্ত্বেও তার জীবন ও চরিত্র ছিল সহজ, আড়ম্ব’রহীন, লৌকিকতামুক্ত।এই অকৃ’ত্রিম চরিত্র-মাধুর্য দিয়ে তিনি সাহাবিদেরকে এমনভাবে ভালোবেসেছেন, আপন করে নিয়েছেন, প্রত্যেক সাহাবিই ভাবতেন, নবীজি (ﷺ) বোধহয় তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আজকের পৃথিবীর বড় অসুখের নাম কৃত্রিমতা। কৃত্রিমতার এই অসুস্থ সময়ে নবীজি (ﷺ)-এর অকৃত্রিম জীবনের পাঠ আজ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। লৌকিকতামুক্ত সুস্থ সমাজ গড়তে আমাদেরকে সেই মহাজীবনের কাছেই ফিরে যেতে হবে বারবার।

